ব্রেকিং

x

প্রেমিকাকে খুন করে লঞ্চের কেবিনেই রেখে ব্রুনাইয়ের ফ্লাইটে ওঠেন দেলোয়ার

বৃহস্পতিবার, ১২ অক্টোবর ২০২৩ | 63 বার

প্রেমিকাকে খুন করে লঞ্চের কেবিনেই রেখে ব্রুনাইয়ের ফ্লাইটে ওঠেন দেলোয়ার

পরকীয়া প্রেমিকাকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তাকে নিয়ে ২০১৯ সালের ১৬ জুন চাঁদপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে লঞ্চে রওনা হন দেলোয়ার মিজি (৪৪)। তিনি বিয়ে তো করেননি উল্টো লঞ্চের কেবিনেই ওই প্রেমিকা নারীকে খুন করে সকালে ঢাকায় নেমে যান দেলোয়ার মিজি। পরদিন ১৭ জুন সকালে মিতালি-৭ লঞ্চের কেবিন থেকে নিলুফা বেগম (৫৭) নামে ওই নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, লঞ্চের কেবিন বুকিং দেলোয়ারের নামে নয় নিলুফারের প্রতিবেশী জাহাঙ্গীরের নামে ছিল। যোগাযোগের জন্য দেওয়া নম্বরটিও ছিল বন্ধ।

নিহত নিলুফার চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। জাহাঙ্গীরের বাড়িও একই এলাকায়। তবে ঘটনার দিন জাহাঙ্গীর এলাকায় অবস্থান করছিলেন বলে জানতে পারে পুলিশ।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ক্লুলেস এ মামলার তদন্তে নিলুফার প্রতিবেশী দেলোয়ার মিজিকে সন্দেহ করেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদস্যরা। কিন্তু ততোদিনে দেলোয়ার দেশ ছেড়ে ব্রুনাই পাড়ি দিয়েছেন। রহস্যের কোন কূলকিনারা করতে না পেরে অপেক্ষা ছাড়া উপায় ছিল না তদন্ত কর্মকর্তাদের। পিবিআই চুপ থাকার কৌশল অবলম্বন করায় অপরাধীও ভেবে নেয় পুলিশের ঘটনার তদন্তে আগ্রহ নেই। এভাবেই দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার বছর পার হয়ে যায়।

দেলোয়ার মিজি গত ২২ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার পরই ঢাকার বিমানবন্দর থেকেই তাকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। কোনও ক্লু না থাকা এবং দেলোয়ার স্বীকার না করায় তদন্তে অপেক্ষা আরও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে দেলোয়ারের মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপে এক প্রতিবেশীকে পাঠানো ভয়েজ মেসেজের সূত্র ধরে উদঘাটন হয় রহস্যের। পরে হত্যাকাণ্ডে নিজের দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দেন দেলোয়ার।

কি ঘটেছিল ৪ বছর আগে :

ভুক্তভোগী নিলুফা বেগম ২০১৯ সালের ১৬ জুন রাত ১০ টার দিকে ঢাকায় আসার জন্য চাঁদপুর থেকে মিতালি-৭ লঞ্চের এস-৩০৯ নম্বর কেবিনে ওঠেন। পরদিন সকাল ৯টার দিকে লঞ্চের কেবিন বয় ভিকটিমের লাশ দেখতে পেয়ে থানা পুলিশকে খবর দেয়। ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিকটিমের ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে ভিকটিমের পরিচয় শনাক্ত করে পিবিআই। এরপর নিহতের ভাই মনির হোসেন এসে লাশ শনাক্ত করেন।

লঞ্চের বুকিং রেজিস্টারে নিলুফার প্রতিবেশী জাহাঙ্গীরের নাম এবং মোবাইল নম্বরটি ছিল ভুক্তভোগীর। নিহত নিলুফা বেগমের সঙ্গে প্রতিবেশী জাহাঙ্গীরের সখ্যতা থাকায় তাকে সন্দেহ করে মামলার আসামি করা হয়। থানা পুলিশের প্রায় এক মাসের তদন্তের পর মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করে। দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের অপেক্ষার পর মামলাটির রহস্য উদঘাটনসহ আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পিবিআই।

অপেক্ষায় থাকা তদন্তে চমক ও কৌশল :

তথ্য প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সালেহ ইমরান আসামি ও ভিকটিমের প্রতিবেশী জাহাঙ্গীরের ব্যাপারে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন। কিন্তু ঘটনার আগে ও পরে জাহাঙ্গীরের কোনও মুভমেন্ট না পাওয়ায় অন্যপথে হাঁটতে থাকেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

তদন্তে ভিকটিমের সঙ্গে একই গ্রামের একটি মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ দেখে সেখানে খোঁজ নেয় পুলিশ। দেখা যায়, সে নম্বরটি প্রতিবেশী এক নারীর। তার সঙ্গে ভিকটিমের মাঝে মধ্যে কথা হতো বলে জানা যায়। তবে ওই নারী পুলিশকে জানায়, তার ব্রুনাই প্রবাসী স্বামী দেশে ফিরলে মাঝে মধ্যে তার মোবাইল ব্যবহার করেন। তবে তিনি ২৬ জুন ব্রুনাই চলে গেছেন।

একপর্যায়ে ব্রুনাই প্রবাসী দেলোয়ারের সঙ্গে ভিকটিম নিলুফার পরকীয়া সম্পর্কের বিষয়টি সন্দেহ হয়। পিবিআই দেলোয়ার মিজির পাসপোর্ট নম্বর সংগ্রহ করে ইমিগ্রেশন পুলিশকে অবহিত করে।

পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, তদন্তের সময় আমরা ওই এলাকায় কোনো তৎপরতা দেখাইনি। যেন সবাই বুঝতে পারে পুলিশের এ বিষয়ে কোনো আগ্রহ নেই। মূলত আমরা দেলোয়ারের দেশে ফেরার অপেক্ষা করতে থাকি।

দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার বছর অপেক্ষার পর গত ২২ সেপ্টেম্বর ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় ঢাকার বিমানবন্দর থেকে দেলোয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর আদালত তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে তাকে পুলিশ হেফাজতে আনা হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদেই বেরিয়ে আসে আসল রহস্য।

যেভাবে রহস্যের উদঘাটন :

পিবিআই জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে দেলোয়ার কোনোভাবেই ভিকটিম নিলুফার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক বা হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি স্বীকার করছিলেন না। তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনের পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন বলেও জানান, তাই সেটিও খোলা যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তারা র‍্যানডম পাসওয়ার্ড বসিয়ে ফোনটি আনলক করতে সক্ষম হন। খুঁজতে খুঁজতে তার হোয়াটসঅ্যাপে এক প্রতিবেশীকে পাঠানো একটি ভয়েজ মেসেজেই বেরিয়ে আসে ক্লু।

দেশে আসার কিছুদিন আগে পাঠানো ওই ভয়েস মেসেজে অভিযুক্ত দেলোয়ার নিলুফা হত্যা মামলার খোঁজখবর নিতে বলেন এবং মামলা শেষ করতে যদি টাকা পয়সাও লাগে সেটার ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে বলেন। দেশে এলে কোনো সমস্যা হবে না এমন আশ্বাসেই তিনি ব্রুনাই থেকে বাংলাদেশে আসেন। এরপর এ বিষয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে দেলোয়ার মিজি নিলুফা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেন।

যে কারণে হত্যা :

জিজ্ঞাসাবাদে দেলোয়ার মিজি জানায়, ভিকটিম নিলুফা বেগমের স্বামী ২০১৫ সালে মারা যান। বাড়িতে তিনি একাই থাকতেন। ২০১২ সালের দিকে ভুক্তভোগীর বাড়িতে কাঠ মিস্ত্রীর কাজের সুবাদে তার সঙ্গে দেলোয়ার মিজির পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠে। ২০১৭ সালে সে ব্রুনাই চলে গেলে ভিডিও কলের মাধ্যমে তাদের মধ্যে কথাবার্তা চলতে থাকে।

দেলোয়ার মিজি ২০১৯ সালের ২৮ এপ্রিল ২ মাসের ছুটিতে দেশে আসেন। দেশে আসার পর সে নিলুফার সঙ্গে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক করে। তখন ভিকটিম নিলুফা তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে। দেলোয়ার নিলুফাকে বিয়ে করবে বলে সময়ক্ষেপণ করতে থাকলে নিলুফা তার বাড়িতে গিয়ে উঠবে বলে হুমকি দিতে থাকে।

দেলোয়ার মিজির বড় মেয়ের বিয়ের আয়োজন করা হলে নিলুফা সেখানে গিয়ে সম্পর্কের বিষয়টি সবাইকে জানিয়ে দেবে বলেও হুমকি দেয়। এরপর দেলোয়ার মিজি ভিকটিমকে কিছুদিন অপেক্ষা করতে বলে এবং বিদেশ যাওয়ার আগেই তাকে বিয়ে করে যাবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। ভিকটিম নিলুফা ১৩ বছরের বড় হওয়ায় দেলোয়ার মিজি এই বিয়েতে রাজি ছিল না। মানসম্মানের কথা চিন্তা করে নিলুফাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৬ জুন দেলোয়ার নিলুফাকে বিয়ের কথা বলে ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য লঞ্চে রওনা দেন। ভুক্তভোগী প্রতিবেশী মুদির দোকানদার জাহাঙ্গীরের নাম এবং নিলুফার মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে লঞ্চের কেবিন বুকিং করেন।

জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত দেলোয়ার জানায়, নিলুফাকে হত্যা করে দায় জাহাঙ্গীরের উপর সুকৌশলে চাপিয়ে দেওয়ার জন্যই লঞ্চে তার নাম ব্যবহার করে সে। কারণ জাহাঙ্গীরের সঙ্গে ভিকটিমের সখ্যতা ছিল। পুলিশের সন্দেহ এড়ানোর জন্য সে তার নিজের মোবাইলটিও বাড়িতে রেখে আসে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী দেলোয়ার এবং নিলুফা ১৬ জুন রাতে চাঁদপুর থেকে মিতালি-৭ লঞ্চের ৩য় তলার এস-৩০৯ নম্বর কেবিনে ওঠেন। লঞ্চ ছাড়ার পর রাত ১২টার দিকে সে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নিলুফার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করে। রাত দেড়টার দিকে বিয়ের কথা নিয়ে ভিকটিমের সঙ্গে তার ফের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে সে ভিকটিমের গলা চেপে ধরে। পরে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে।

এ বিষয়ে পিবিআই প্রধান বলেন, ভুক্তভোগীর সঙ্গে তার সম্পর্কের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ভুক্তভোগীর মোবাইলে থাকায় অভিযুক্ত দেলোয়ার দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে বিদেশ চলে যায়। দেশে ফেরার সময় সেগুলো সঙ্গে আনেননি দেলোয়ার। যেহেতু সেই মোবাইলগুলো উদ্ধার করা যায়নি, তাই সেই আলামতও পাওয়া যায়নি। এরপর তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

Development by: webnewsdesign.com